Founder

Khan Bahadur Ahsanullah (R.)

খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা (র:)-এর অমিয় বাণী

যত তারিফ, যত প্রশংসা সবই প্রাপ্য খোদাওয়ান্দ করীমের, যিনি রাব্বিল আলামীন, যত আমল আছে, যত জগত আছে, যত বিশ্ব আছে সকলেরই পয়দাকারক তিনি। আর রব শব্দ কোরান শরীফের মধ্যে ৬০০০ জায়গায় রয়েছে। রব শব্দের অর্থ খালি পয়দাকারক নয়, পয়দাকারক আর পরিপোষক – পরিপুষ্ট করা। যে নিয়ত আছে সে নিয়তকে পূর্ণ করবার জন্য যতকিছু উপায় অবলম্বন করার তিনি সেই সমস্ত উপায় অবলম্বন করেন। দুনিয়াকে সৃষ্টি করেছেন। আর সেই দুনিয়াকে ক্রমে পরিশোধিত করতে আছেন। আর যে পর্যন্ত তার উদ্দেশ্য পূর্ণ না হবে সে পর্যন্ত দুনিয়ার উন্নতি হতে থাকবে। কেয়ামত আসবে না। দুঃখের বিষয়, আমরা পড়ে যাই সুরা ফাতেহা, সেই সুরা ফাতেহার মধ্যে কি আছে সে খেয়াল আমরা করি না।

এখানে আছে সাতটি আয়াত শরীফ। তার মধ্যে ৩টি হচ্ছে খোদাওয়ান্দ করীমের গুণের বয়ান। আর চারটি আমাদের কি কর্তব্য। প্রথমে বলা হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহে রাব্বুল আলামীন – যত তারিফ, যত প্রশংসা, যত চিন্তা সবই প্রাপ্য খোদাওয়ান্দ করীমের। আর তিনি রহমানুর রাহীম, দয়ার সাগর তিনি। খালি দয়ার সাগর নন, তিনি বাকশিশ করনেওয়ালা। আমাদের যত বান্দার যত কিছু গুনা যত কিছু ত্রুটি, হজরত রছুলে করীম (দ:) তাঁর উম্মতের জন্য দোয়া করবেন, আর খোদাওয়ান্দ করীম একবার করে বাকশিশ করবেন। তো বাকশিশ করনেওয়ালা হচ্ছেন খোদাওয়ান্দ করীম। আর কেউ বাকশিশ করতে পারবে না। আর সেই খোদার উপর বান্দার চাই সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করা।

মানুষ হতে হলে পশুত্বকে দূর করতে হবে কিংবা বশীভূত করতে হবে। ইন্দ্রিয়গুলোকে দমন করতে হবে। রিপুগুলোকে দমন করতে হবে। আর তা ছাড়া অন্তরেন্দ্রিয়কে দমন করতে হবে। আমরা আমাদের মধ্যে সকলেরই মধ্যে খোদী আছে, আমিত্ব আছে, অহমিকা আছে। যে পর্যন্ত আমরা অহমিকাকে বর্জন করতে না পারব সে পর্যন্ত খোদার দীদার লাভে এই দুনিয়ার বুকে সম্ভবপর হবেনা। খোদার অনুগ্রহ পেতে হলে নিজেকে একেবারে লয় করে দিতে হবে। নিজের যেন মাত্র কোন প্রকার ফখর না থাকে। খোদার যত বান্দা আছে, যে জাতের হোক, যে ধর্মের হোক, যে স্থানের হোক, সকলকে সমভাবে খেদমত করা। আর তাদের খেদমত করলে খোদাতালার সন্তুষ্টি সাধিত হয়। দুঃখের বিষয়, আমরা মুছলমান মনে করি যে আমরাই সবকিছু।

খোদাওয়ান্দ করীম যত বান্দা সৃষ্টি করেছেন, সকলের মধ্যে তার রূহ আছে, তারই শরীরের অংশ আছে। আমি যদি কোন বান্দাকে যদি একটু ঘৃণা করি তাহলে খোদাকেই ঘৃণা করা হয়। আপনার সন্তানকে যদি আমি ঘৃণা করি তাহলে আপনাকে ঘৃণা করা হবে। দুঃখের বিষয় আমরা তা বুঝিনা। সেই জন্য আমাদের চাই, খোদাকে পেতে হলে প্রথমে অহমিকাকে একেবারে ত্যাগ করতে হবে। ঘৃণাকে ত্যাগ করতে হবে। ঈর্ষাকে ত্যাগ করতে হবে। দ্বেষকে ত্যাগ করতে হবে। রীপুকে ত্যাগ করতে হবে।

আর সারা প্রাণটি দিয়ে খোদার বান্দার সেবা করতে হবে। তামাম পৃথিবীতে প্রকৃতি দেখুন, প্রকৃতির দিকে একবার চেয়ে দেখুন, একবার অনুধাবন করুন, প্রত্যেকটি গাছ প্রত্যেকটি পাতা, প্রত্যেকটি পাখি, প্রত্যেকটি পশু, প্রত্যেকটি কীট, প্রত্যেকটি খোদারই গুণকীর্তন করে। শেষ রাত্রি হলে তখন দেখুন, পাখীরা ডাকতে থাকে, পাখীরা যে খোদাকে ডাকে, তাদের নিজের প্রত্যেকের নিজের স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র ভাষা, আর সেই ভাষা দিয়ে খোদাকে ডাকে। আর মানুষ নিজের চিন্তায় এত গর্বিত – শুয়ে থাকে। পাখীরা ডাকে, মোরগেরা ডাকে, উঠো খোদাকে ইয়াদ করো, ইবাদত করো, আর তারা ঘুমিয়ে নিদ্রায় থাকে। বড়ই আফসোসের কথা।

যাই হোক, আমাদের মনে করতে হবে, যে খোদাওয়ান্দ করীম বড়ই অনুগ্রহ করে আমাদিগকে, মানবকে সৃষ্টি করেছেন। যিনি এতধিক অনুগ্রহ বান্দার জন্য করেছেন, সেই বান্দার কর্তব্য কি?

আজ আমরা এই সন্ধ্যায় যা কিছু বলছি, সমস্ত রেকর্ড হয়ে যাবে। কোন জিনিসের বিনাশ নাই। মসজিদে যা আমরা এবাদত করি সমস্ত পুঞ্জীভূত হয়ে থাকে। আমাকে এক বন্ধু বলছিলেন যে, নলতার মসজিদে যখন যাই, নামাজ পড়ি তখন নামাজ পড়তে কি এক আনন্দ পাই। আবার অন্য মসজিদে গেলে সেখানে মনে হয় উঠলে বসলে হয়।

যেখানে খোদার কালাম হামেশা পঠিত হয় সেখানকার যে পরিস্থিতি যে স্বতন্ত্র পরিস্থিতি। আমরা বুঝিনা যা কিছু দুনিয়াতে সৃষ্ট সবই মানুষের জন্য। সারা প্রকৃতি, সারা উদ্ভিদ, সারা জিনিস সবই খোদা সৃষ্টি করেছেন। এই বান্দার খেদমতের জন্য আর সেই বান্দা কি উদাসীন। এটিই আফসোস!

আমাদের অনেকের ধারণা আছে যে আলেম হলে বাস আর কিছু চাই না। কিন্তু এলেম আমাদের সঙ্গে যাবে না, আমাদের সাথে যাবে আমল। ‘ওয়াছেয়া কুরছিইউহুছ ছামাওয়াতে ওয়াল আরদে’ আমরা কোরান শরীফে পড়ে থাকি। খোদাওয়ান্দ করীম যত ভুমন্ডল আছে, একটা নয়, যত ভুমন্ডল আছে, যত আকাশমন্ডল আছে, সব দেখতে আছেন, তাঁর কুরছি সব জায়গায় রয়েছে। আর তা ছাড়া যেখানে কিছু নাই, জমি নাই, পানি নাই, বায়ু নাই সেখানেও খোদা বিরাজমান। আর সেই খোদাকে মানুষ যদি একটু চেষ্টা করে, সেই মহব্বত যদি হাছেল করে, নিজের পশুত্বকে দমন করে, যদি রূহানী শক্তিকে জাগায় তাহলে যখন তখন যে খোদাই সমস্ত অসীম জগত, সসীম জগত এবং বাইরের যে জগত আছে সে খোদাকে এক মুহূর্তের মধ্যে মানুষ, সেই মহব্বত উপলব্ধি করতে পারে। তাঁর রহমতের ইঙ্গিত লাভ করতে পারে।

আর রাত্রি ঘিরে আমি দেখি, এই আমি বৃদ্ধ আমি বেঁচে আছি কেবল তাঁরই রহমতে। সেদিন আমি বলতেছিলাম, ছোট ছেলে যখন দোলনায় বসে আছি, এমন সময় ওয়ালেদ সাহেব শুয়ে আছেন দোতলায়, ঘুমোচ্ছেন। ঘুমিয়ে উঠে বলছেন যে, আজ তোমার সম্বন্ধে এই দেখেছি। আর তিনি যা বলেছেন তাই এখন আমি সারা জীবন ভরে পাচ্ছি।

তো খোদাওয়ান্দ করীমের জ্ঞান-তিনি জ্ঞানময়। তাঁর কাছে অতীত নাই, ভবিষ্যত নাই, সবই বর্তমান। সবকিছু তিনি দেখতে পাচ্ছেন। আর সেই খোদা সর্বত্র বিদ্যমান, সর্ব বস্তুর মধ্যে বিরাজমান। আর তাকে মানুষ যদি একটু চেষ্টা করে – মানুষকে এত ক্ষমতা দিয়েছে মানুষ যদি একটু চেষ্টা করে তাহলে এক মূহুর্তের মধ্যে তাঁর অস্তিত্বের উপলব্ধি করতে পারে।

সুরা জিলজালালে বলেছেন, আমাদের নেকী আমাদের বদী সবই লিপিবদ্ধ হচ্ছে। আগে আমরা বুঝতাম না, এখন বুঝতে পাচ্ছি। লিপিবদ্ধ মানে রেকর্ড। এই আজকের রেকর্ড দেখলাম। যা কিছু আমরা করি সমস্তই কেরামান কাতেবীন খোদাতালার ফেরেশতারা তারা এমনভাবে এডজাস্ট করছে, যে সবই আমাদের রূহের উপর যেন পড়ে। যত কুচিন্তা করি, যত কুকাজ করি, সমস্তর একটা কালিমা আমাদের রূহের উপর পড়ে।

রূহটা আমি আগেই বলছি একটা লাইটের স্বরূপ। একটা জ্যোতি স্বরূপ, এ জ্যোর্তিম্ময় He is the light, the energy। তো আমাদের রূহটা তো তাঁরই কাছ থেকে তাঁরই একটি রূহের অংশ। তিনি রূহ আলা রূহ। আর গরীবের যে রূহ এ তাঁরই রূহের অংশ মাত্র। আর খোদাওয়ান্দ করীম এত অতি স্বচ্ছ। তাঁর মধ্যে কোন রকম মলীনতা নাই। আল রূহের যে অংশ আমরা পেয়েছি তাতো স্বচ্ছ। কিন্তু আমাদের কর্মদোষে আমাদের চিন্তাদোষে সেই স্বচ্ছ রূহের উপর কালিকা পড়ে যায়। যখন কালিমা পড়ে যায় তখন সেই যে নূর আলা নূর তার reflection তার উপরে পড়ে না।

একটা দর্পন নেন। পরিষ্কার যদি থাকে, একটা আলোর সামনে যদি রাখেন, তাহলে সেই দর্পন দিয়ে, স্বচ্ছ দর্পন দিয়ে, চারিদিকে আলোকিত হয়ে যায়। আলোকের ছটা চারিদিকে বিস্তৃত হয়। আর যদি সেই আয়নাতে ময়লা পড়ে থাকে তাহলে যতই চেষ্টা করুন না কেন তা থেকে আলো বেরুবে না। তো সেই রকম আমাদের রূহে যদি কালিমা পড়ে যায়, তাহলে যতই এলেম হাসিল করনা কেন কিছুতেই খোদার সঙ্গে লাগোয়া পয়দা হবেনা। খোদার reflection সেই নুরুন আলা নুরের reflection আমার রূহের উপর পড়বে না। কাজে কাজেই তার নৈকট্য আমি হাছিল করতে পারব না।

আমরা ভুলে যাই যে যা কিছু আমরা করছি সমস্তই রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে। যখন আমরা মরে যাব তখন দেহ চলে যাবে, ইন্দ্রিয় চলে যাবে, আহার চলে যাবে, বিহার চলে যাবে, সবই চলে যাবে। কেবল থাকবে রূহ, যার বিনাশ নাই। যে রূহ খোদারই রূহের অংশস্বরূপ সে রূহের বিনাশ নাই। সে রূহ যাবে রোজহাশরতক। আর সেই রূহের উপর সমস্ত রেকর্ড থাকবে। যে চিন্তা আমরা করেছি, যে কাজ আমরা করেছি, সমস্ত তারই উপরে রেকর্ডেড হয়ে থাকবে।

সেজন্য বাবা সকল, আমাদের চাই আমেল হওয়া, আলেম হলে এলম আমাদের সঙ্গে যাবে না। বরঞ্চ এলম আমাদের হেজাবে আকবার। আমি আলেম, এই বলে যে একটা অহংকার এ সকলের মধ্যে আছে। যে গ্রাজুয়েট, যে আর্টিষ্ট, যে মাওলানা সকলের মধ্যে সে খোদী আছে। আর এই খোদী যাবেনা, যাবে কেবল আমাদের যা কিছু কর্মফল আর চিন্তাফল। আমরা সাধারণতঃ মনে করি, যে কাজ করি যে অন্যায় কাজ করি শুধু সেইটুকু যাবে। তা নয়। আমরা চিন্তাতে বেশী অন্যায় করি। যত শিক্ষিত লোক, সকলের মধ্যেই খোদী আছে, সকলেরই মধ্যে রিয়া আছে, সকলেরই মধ্যে কমবেশী ঈর্ষা আছে, হিংসা আছে, দ্বেষ আছে এইগুলি থেকে মানুষ যদি পৃথক হতে পারে, এগুলি যদি বর্জন করতে পারে, তাহলে খোদার সানিড়বধ্য সহজে লাভ করতে পারে।

দুঃখের বিষয়, আমরা সর্বদাই গায়ের খোদাকে চিন্তা করি। আপনারা এখানে বসে আছেন, কেবল চিন্তা করছেন, এখান থেকে উঠে গিয়ে কোথায় যাবো কি হবে, যাকে সবচেয়ে ভালোবাসা যায় তারই চিন্তা সকল সময় মনে আসে। আর আপনি যাকে সবচেয়ে বেশি আপন বলে জানেন – আপনার যদি একটা ছেলে থাকে আর তার উপর যদি আপনার সম্পূর্ণ মহব্বত থাকে, তাহলে যেখানে থাকেন সেই ছেলেরই কথা সর্বদা আপনার মনে পড়ে।

দেখুন আমরা সবে ভবে মত্ত, সংসারে মত্ত। সম্মানের পিপাসু। খোদা পিপাসু কজন আছে? তাই বলি বাবা সকল, সকল কাজ করুন, সন্তানাদিকে ভালোবাসুন, সংসারকে রক্ষা করুন, সৎপথে ধন অর্জন করুন। কিন্তু মনে করবেন এ সমস্ত খোদারই ধন। এসমস্ত দিয়েছেন খোদাওয়ান্দ করীম। তিনি আমাদের আহার দিয়েছেন, আমাদের সম্মান দিয়েছেন, আমাদের সংসার দিয়েছেন, আমাদের উপার্জনের জন্য ধন দিয়েছেন। সবকিছু দিয়েছেন। আর তাঁকে আমার কতটুকু চিন্তা করি। দান নিয়েই অস্থির। আমরা সবাই অধিকাংশই ধনপুজক। খোদাপুজক খুবই কম। দুনিয়ার মধ্যে আর যদি যে আপনি যে মুহূর্তে আপনি দান থেকে দাতার উপর অধিকতর আকর্ষণ পয়দা করবেন, ঠিক সেই মুহূর্তে দেখবেন খোদাওয়ান্দ করীম আপনার কত নিকটবর্তী।

আপনি এক পা যদি খোদার দিকে বাড়ান খোদা আপনার দিকে দশ পা বাড়াবে। আপনি খোদার আশেক হয়ে যান, খোদাই আপনার আশেক হবে। এমন খোদার ইছলামে শিক্ষা যাহা, এই শিক্ষাকে বিস্তার আমার জীবনের এই উদ্দেশ্য। আমি আপনাদের কাছে ঘুরে বেড়াই। আমার বড়ই ইচ্ছা, আমার বাবারা যেন খোদার আশেক হয়। সকল সময় যেন সব কাজ করুন। তারই সঙ্গে যেন খোদারই কথা মনে থাকে। সেই চিন্তাটাই যেন প্রবল থাকে।

এই কথা আপনি কোথাও শুনবেন না। যেখানেই শুনবেন মৌলভী মওলানাদের কাছে কেবল শুনবেন দোজখের ভয় আর বেহেস্তের জয়। কিন্তু খোদাকে কি করে পাওয়া যাবে সেকথা কেউ বলে না। আর যারা প্রচারক তারা নিজের জ্ঞানের জন্য মত্ত, নিজের খোদীর জন্য অস্থির। সেইজন্য এইগুলিকে যদি আপনি বশীভূত করে খোদা যেই শক্তি আপনাকে দিয়েছেন সেই শক্তিকে যদি বর্ধিত করেন তো দেখুন খোদা আপনাকে হর মুহূর্তে আপনারই সেবায় প্রস্তুত থাকবেন।

আমি আশ্চর্য হয়ে যাই, যে খোদা সমস্ত পৃথিবী নিয়ে ব্যস্ত। আমাদের একটি পৃথিবী নয়, এরকম শত শত পৃথিবী আছে, কত সুর্য আছে, কত গ্রহ আছে, কত গ্রহ উপগ্রহ আছে, আর সমস্তকে তিনি পরিচালনা করছেন। সেই খোদাকে মানুষ যদি একটু চেষ্টা করে মুহুর্তের মধ্যে অমনি সেই খোদাকে তাঁর ইঙ্গিত পেতে পারেন। তাঁর মহব্বত পেতে পারেন, সবই কিছু পেতে পারেন। খোদাতা’লার এতই দরদ তাঁর বান্দার জন্য যা বলা যায়না।

আর দুঃখের বিষয়, আমরা সেই খোদাকে ভুলে আছি। অধিকাংশই আমরা সংসার পুজক। দু’জনকে সমানভাবে পুজা করা যায় না। দু’জনকে সমানভাবে এবাদত করা যায় না। একজনের যদি দুই স্ত্রী থাকে সেই দুই স্ত্রীকে ঠিক সমানভাবে সে ভালবাসতে পারে না। তো সেই রকম সৃষ্ট আর স্রষ্টা দুইকে সমভাবে মানুষ ভালোবাসতে পারেনা। সৃষ্টিকে ভালোবাসুন কিন্তু সবচেয়ে অধিকতর মহব্বত রাখুন স্রষ্টার প্রতি। তাহলে দেখবেন এই দুনিয়ার মধ্যে দেখবেন, এই দুনিয়াই আপনার বেহেশত হয়ে যাবে। বেহেশত নেমে আসবে এখানে, শান্তি নেমে আসবে এখানে। অনেক সময় আমি দেখেছি, যা কিছু চাওয়া যায় তাই পাওয়া যায়। এত অনুগ্রহ তার। সামান্য একটি বান্দা, ৩১৭ কোটি বান্দা রয়েছে। আর তার মধ্যে একটি বান্দা যদি কিছু একটা যাচনা করে অমনি তখনই খোদাওয়ান্দ করীমের সাড়া পাওয়া যায়। তাই বলি বাবা সকল, এমন খোদাকে যদি আমরা না চিনতে পারি তবে নিজেদের জীবন বৃথা।

আমরা ছেলেপুলের জন্য কত কিছু করি। আর পিতার ভক্তি নেওযার জন্য, মহব্বত নেওয়ার জন্য ছেলেরা কত চেষ্টা করে। কিন্তু যিনি পিতার পিতা, সকলের পিতা, তার জন্য আমরা কতটুকু মহব্বত রাখি। কতটুকু চিন্তা করি। তাই বলি বাবা সকল, সকল কাজের মধ্যে সকল চিন্তার মধ্যে তাঁর চিন্তাকে প্রবল রাখবেন। পয়সা লাগবে না। কড়ি লাগবে না, কিছুই লাগবে না তাঁর চিন্তা করতে। তাই একবার চিন্তা করুন, যে তাঁর বান্দার প্রতি কত অনুগ্রহ।

আমি সবাইকে বলি তাহাজ্জদ নামাজ পড়তে। আর তাহাজ্জদ নামাজের পর কিছু সময় মোরাকাবা বা ধ্যানে বসতে। ঐ সময় ধ্যান করতে হবে কেবল খোদাকে। চেষ্টা করুন। যখনি আমরা নামাজ পড়ি তখনই দুনিয়ার সমস্ত চিন্তায় আমাদেরকে ঘিরে। কিন্তু রাত্রিতে যখন সমস্ত প্রকৃতি নিস্তব্ধ থাকে, সন্তানাদি ঘুমিয়ে থাকে, সেই সময় সুযোগ সহজতর হয়, খোদার দিকে সমস্ত চিন্তাশক্তিকে নিয়োজিত করা।

খোদা আমাদের দেহ ভঙ্গি দেখেন না, তিনি দেখেন আমাদের অন্তর। অন্তরটি কোথায় আছে, কি চায়, আর সেই অন্তরের মধ্যে যদি দুনিয়াবী চিন্তা আসে, খোদা সেখান থেকে দুরে সরে যায়। খোদা চান না যে তাঁর সঙ্গে তাঁর আসনে দুনিয়াবী বস্তু স্থান পাক। তাই বাবা সকল, একটু চেষ্টা করুন, সমস্ত অন্তরটিকে দিয়ে প্রেমময়কে চিন্তা করুন। দেখুন কি পান। একদিনে না হোক, দু’দিনে না হোক, তিন দিনে না হোক একসময় পাবেন যদি আপনি চরিত্রবান হন। যদি আপনার নফস দমন থাকে। আর যদি নফস দমন না থাকে, হাজার এলেম হাছেল করুন, কিছুতেই খোদার সংস্পর্শে আসতে পারবেন না। খোদার অনুগ্রহের উপলব্ধি কখনো করতে পারবেন না।

অনেকে বলেন, যে আমি চেষ্টা করি। নামাজ পড়ার সময় চেষ্টা করি, কিন্তু মন আমার অন্যদিকে যায়। তাই তাঁদের বলি যখন পাখী শিকার করেন, তোমার মন কোন দিকে থাকে। পাখীর সঙ্গে আর তোমার বন্দুকের মাছির সঙ্গে যদি সমান সুত্রপাত হয় তখনই পাখী ঢলে পড়ে যায়। তো সমস্ত চিন্তাকে দূর করে তোমার শিকারের দিকে যদি খেয়াল থাকে আর তাহতে শিকার তখনি পড়ে যায়। আর তা যদি না হয়, অন্যদিকে খেয়াল থাকে কখনো শিকার পড়ে না। তো যখন পাখি শিকার করতে পারো, খোদাকে শিকার করতে পারো না? এ ছেলে খেলা! একটু চেষ্টা করো। কিন্তু ঐ যে বলছি, আমাদের অন্তরায় হচ্ছে পশুত্ব। প্রত্যেকের মধ্যে পশুত্ব আছে। প্রত্যেকের মধ্যে ঋষিত্ব আছে। প্রত্যেকের মধ্যে শয়তানী খেয়ালত আছে। আবার প্রত্যেকের মধ্যে খোদার রূহ, রূহের অংশ আছে। খোদার শক্তি আছে।

যতই চেষ্টা করবেন পশুত্বকে দমন করতে, নফসকে দমন করতে ততই রূহানী শক্তির বৃদ্ধি হবে। আর যতই রূহানী শক্তির বৃদ্ধি হবে ততই খোদার রহমত নানাভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। তখন জীবন সার্থক হবে। এই দুনিয়ার ভিতরে মানুষ খোদাকে নিজের নিজস্ব করে নিতে পারে। এত দয়া খোদাওয়ান্দ করীম বান্দাকে দিয়েছেন।

বান্দা যদি খোদার আশেক হয়, খোদাই তার আশেক হয়। খোদাই নেয়ামত নিয়ে চারিদিকে তাকাতে আছেন যে, নাও নেয়ামত নাও, নেয়ামত নাও, নেয়ামত নাও। কোথায় আমরা সব উদাসীন। কেবল নিজের যে স্বার্থ আমরা পূজা করি। তাই বলছিলুম যেখানে স্বার্থ পুজা আছে সেখানে খোদা পুজা নাই। দুই বস্তুকে একই সময় পুজা করা যায় না। ইবাদত করা যায় না। ইয়াদ করা যায় না। দেখুন আমাদের অধিকাংশই সব স্বার্থ পুজক। যাতে স্বার্থ হাছিল হবে, সেইজন্য সমস্ত জীবন দিয়ে আমরা ছুটাছুুটি করি। খোদার জন্য ছুটাছুটি ক’জন করি। খোদা রাহমানুর রাহিম। দয়ার সাগর। কোন শব্দে প্রকাশ করা যায় না তার গুণবত্তাব কথা। মানুষের প্রতি তাঁর এত দয়া যার সীমা নাই। কিন্তু দুঃখের বিষয় অন্ধ মানুষ। সে নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। দু’দিন পরে যেখানে যেতে হবে তার জন্য কতটুকু মানুষ চেষ্টা করে।

একদিন আমি গেছি আমাদের পূর্বতন ইন্সপেক্টর মাওলানা আব্দুল জলিল সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে। জিজ্ঞাসা করি, মৌলভী সাহেব, কেমন আছেন। তিনি বলছেন, বাবা বৃদ্ধ হয়ে যদি স্ত্রীকে হারাই তবে তার মনের অবস্থা কি হয়। বলতে বলতে তিনি বললেন, আমি অনেক চেষ্টা করেছি অনেক গণকের কাছে গিয়েছি যে একবার আমি স্ত্রীকে যদি দেখতে পারি। হঠাৎ একদিন তিনি নিদ্রাযোগে এসে উপস্থিত। আমি জিজ্ঞাসা করছি যে, তুমি কেমন আছো।

» খোদা আমাকে খুবই ভালো রেখেছেন।

» আমি তোমার সাথে যেন যেতে পারি দেহত্যাগের পর।

তো তিনি বলছেন, আপনি যা কিছু করেছেন, এ কাফি নয়, এ যথেষ্ঠ নয়। আরও কিছু খোদার দিকে অগ্রসর হতে হবে।

» তো আমার জন্য একটু দোয়া করবেন।

» তো দোয়া আমিও করবো, আপনিও করবেন। কিন্তু তিনি বেনেয়াজ। চাইলেই যে অমনি তিনি দেবেন তা নয়। যার যতটুকু নেকী ঠিক সেই পরিমাণ তাকে বেহেশতের সেই অংশটুকু দেবেন।

তাই তিনি বললেন যে, জিজ্ঞাসা করলাম নওয়াববাড়ীর এক সলিসিটর যে আমার ছেলের সঙ্গে বিলেতে ছিল। সেখান থেকে পাশ করে এসেছে তার কথা। সে বেহেশতে আছে বটে, কিন্তু বেহেশতের গুদামঘরে নি¤ড়বস্তরে। যখন বিলেতে ছিল তখন এক বেটির আশেক হয়, ভালোবাসার মধ্যে পড়ে যায়। আর তারই ফলে যখন মৃত্যু হয়ে যায়, তখন তাকে দেখা যাচ্ছে যে, বেহেশতে আছে বটে, কিন্তু সবচেয়ে নিকৃষ্ট অবস্থানে।

নওয়াববাড়ীর আর এক লোকের কথা জিজ্ঞাসা করলাম। আমি তার সঙ্গে একসময় গিয়েছিলুম মধুপুর বায়ু পরিবর্তনের জন্য। লোকটি অতি সৎ ছিল। তার কথা জিজ্ঞাসা করলাম।

» তিনি আছেন, বেহেশতে আছেন মধ্যম পর্যায়ে। তার মনে ঐ স্ত্রী তার উপরে আছে।

এই যে বেহেশতের আট পর্যায় ক’জন তা আমরা জানি। আমাদের যে রকমভাবে নেকী হবে। আমরা হয়ত মনে করি এখানে যে স্ত্রীকে নিয়ে আছি সেখানে সেই স্ত্রী পাবো। কখখনো নয়। যার যতটুকু নেকী ঠিক সেই অনুসারে বেহেশতের সেই স্থানে সে যেতে পারে।

যাই হোক, বাবা সকল, ফাঁকি দেওয়ার যো-টি নাই। যা কিছু করবেন সবকিছু রেকর্ড হয়ে থাকবে। তাই বলি যে আমল যাতে দুরস্ত হয়, আমল দুরস্ত করতে চেষ্টা করবেন। আমাদের সঙ্গে আমলই যাবে। এলম যাবেনা। এলম বরঞ্চ হেজাব সৃষ্টি করে, খোদী সৃষ্টি করে। আমিত্ব সৃষ্টি করে। খোদাকে পেতে হলে একেবারে নিজেকে ভুলে যেতে হবে। নিজেকে একেবারে ধুলিবৎ করতে হবে। কোন প্রকার অহংকার কাছে যেন না আসে। তারপরে এবাদত করতে বসুন সমস্ত অন্তরটি দিয়ে।

আমি জানি, দু’একটি-স্ত্রী লোকের কথা জানি, একটি পুরুষের কথা জানি। যে বলেছিল, যখন ধ্যানে বসেছেন, নামাজের পর, তাহাজ্জদ নামাজের পর, চিন্তা করতে করতে এমন অবস্থা হয়েছে যে নিজকে হারিয়ে ফেলেছে, নিজের হাস্তিজ্ঞান লোপ পেয়ে গেছে। খোদা তখন রূহের মধ্যে প্রবেশ করেছে। আনাল হক হয়ে গেছে। এই মানুষ এই আপনারা আমরা যেই মানুষ আছি এ থেকে যদি আমরা চেষ্টা করি, তাহলে ঐ অবস্থানে নিয়ে যেতে পারি। সেই অবস্থা বেশীক্ষণ থাকেনা। কিন্তু যে একবার পেয়েছে জীবনের মধ্যে সে বেহেস্তকে খরিদ করেছে।

বেহেশত কিছুই না। নেকীর ভাগ যদি বদীর থেকে এক ডিগ্রী বেশী হয় তাহলে বেহেশতী। এখানে আপনারা যত লোক আছেন আমার তো বিশ্বাস সকলেই বেহেশতী। কিন্তু খোদাকে পেতে হলে বেহেশত কি হবে। তাই হজরত রাবেয়া বলে গেছেন যে, দেখো আমি দু’হাতের এক হাতে পানি নিয়ে যাচ্ছি, এক হাতে আগুন নিয়ে যাচ্ছি। যে পানি দিয়ে দোজখকে নিভাব আর আগুন দিয়ে বেহেশতকে জ্বালিয়ে দিব। আমি পরওয়া করিনা বেহেশতের, খোদাকে যদি পাই তো বেহেশত দিয়ে কি হবে। এই সমস্ত লোক বেহেশতেই তো যাবে। যারা থাকবে, রোজহাশরের সময় তিনভাগ হবে। ডাইনে একভাগ থাকবে, বাঁয়ে একভাগ, সামনে একভাগ, অলি আল্লাহ যাঁরা থাকবে তাঁদের সমস্ত শরীর দিয়ে স্ফুলিঙ্গ বের হতে থাকবে। জ্যোতি বের হতে থাকবে খোদা তাদের আর জিজ্ঞাসা করবেন না, সকলকে বেহেশতে এনায়েত করবেন।

আপনারা দেখুন, একটু দেখুন নামাজ পড়বার সময় দেখবেন চারিদিকে খোদার নুর রয়েছে। নুর-ই-নুর। তো খোদাকে যদি পাওয়া যায় তবে বেহেশতে কি হবে। বেহেশত কি করবেন যেখানে অধিকাংশ লোক এই বেহেশতে যাবে। দোজখে যাবে খুবই কম লোক।

খোদা সৃষ্টি করেছেন যেমন আমরা শুনি প্রচারকের কাছে যে দেহের উপর আগুন দিয়ে জ্বালানো হবে, লোহা দিয়ে লোহার হাতুড়ি দিয়ে মারতে হবে। কত কিছু। তো খোদা তিনি জ্ঞানময়। তিনি বান্দাকে সৃষ্টি করেছেন কেবল দোজখে ভরতে? আমাদের মধ্যে যে যত অন্যায় করবে তার রূহেতে তত কালিমা গভীর হয়ে দাঁড়াবে। আর খোদাওয়ান্দ করীম আমাদের সকলকে free will দিয়েছেন। ইচ্ছে হলে ভালো কাজ করতে পারি। ইচ্ছে করলে মন্দ কাজ করতে পারি। তো সেই মন্দ কাজের জন্য মন্দ চিন্তার জন্য আমরা সকল কালিমা অর্জন করি। আর খোদা এত রহমান এত রহিম তিনি মৃত্যুর পরে বান্দার জন্য চেষ্টা করবেন যে কিসে কালিমাটা দুরীভুত হয়। এই বান্দার অন্তরের কালিমা দুর করে তাকে প্রমোশন দিবেন বেহেশতে। এই খোদারই ইচ্ছা। এমন রহমান, এমন দয়ালু খোদা কেউ চিন্তা করতে পারেন?

আমরা সমস্ত জীবন দিয়ে ইচ্ছা মত কত ন্যায় অন্যায় করলাম, আর শেষ কালে যখন আমরা ভোগ করতে যাবো, কষ্ট ভোগ করতে যাবো, অমনি খোদা চিন্তা করবেন কিসে আমাদের সেই কালিমাটা দূর করে আমাদের বেহেশতে প্রমোশন দিতে পারেন। কেবল নাস্তিক যারা তাদেরই বেহেশত হবে না। কিন্তু তাছাড়া যাদের কালিমা যত হালকা সে বেহেশতের তত উচ্চস্তর পর্যায়ে যাবে। সেজন্য চিন্তা করে দেখুন যে খোদাওয়ান্দ করীম কত দয়াময়, দয়ার সাগর, যা কথার দ্বারা আমরা প্রকাশ করতে পারি না। আমরা মানুষ। আমাদের জ্ঞান সসীম, আমাদের ভাষা সসীম। কিন্তু তার রহমত অসীম। একটু বাবারা একটু অগ্রসর হউন। দেখুন আপনাদের জন্য – যাই হোক, অনেক সময় আমি নিলাম। আপনাদের কাছ থেকে কিছু শুনতে চাই

Khan Bahadur Ahsanullah (R.) Speech

» Text
» Voice
 
 

Munajat